বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১২

গ্রামীন ফোন! টেলিনর বনাম ডক্টর ইউনুস। একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

গ্রামীন ফোন! টেলিনর বনাম ডক্টর ইউনুস। একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

গ্রামীন ফোনের মুল সপ্ন দ্রষ্টা হচ্ছেন ডক্টর ইকবাল কাদির। ১৯৯০-৯৪ সালে তিনি তখন একটি বিনিয়োগ পরামর্শক সংস্থা পরিচালনা করতেন। তিনি সে সময় চিন্তা করেন যে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন জিনিস উৎপাদিত হয়। কিন্তু শহর বা ভোক্তা শ্রেনীর সাথে কোন সহজ যোগাযোগ বা তথ্য আদান প্রদান ব্যবস্থা না থাকার কারনে উৎপাদনকারী এবং ভোক্তার মধ্যে একটি বড় অংশ দালাল বা ফড়িয়ারা নিয়ে যাচ্ছে এবং ভোক্তাদের চাহিদা সম্পর্কে উৎপাদকের ও কোন ধারনা থাকেনা। ডক্টর ইকবাল কাদির এসময় নিজের উদ্যোগে একটি বিনিয়োগ সংস্থা গনফোন লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ডক্টর ইকবাল এর পর বাংলাদেশে আসেন এবং সরকার ও তার পরিচিত জনদের সাথে বাংলাদেশে গ্রামে গ্রামে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক স্থাপন বিষয়ে আলোচনা করেন। সে সময় বাংলাদেশে একমাত্র মোবাইল ফোন অপারেটর প্রতিষ্ঠান টি ছিল সিটিসেল। উন্নত টেকনলজি সত্বেও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারনে এবং দেশিয় উদ্যোক্তাদের অদুরদর্শিতার জন্য পঞ্চাশ শতাংশ দেশিয় বিনিয়োগ থাকা এই কোম্পানিটি তখন সাধারন মানুষের হাতের নাগালে মোবাইল ফোনটি পেীছিয়ে দিতে সক্ষম হয়নি। ডক্টর ইকবাল কাদির এর সাধারন মানুষের নাগালের মধ্যে মোবাইল ফোন পেীছে দেয়ার পরিকল্পনা তখন অনেকের কাছেই অসম্ভব মন হয়েছিল। এমনকি খোদ ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুসও প্রথমে এই পরিকল্পনাটিকে গুরুত্ব দেননি। তবুও শেষ পর্যন্ত ডক্টর ইকবাল কাদির ডক্টর ইউনুস কে তার পরিকল্পনায় বিনিয়োগে সম্মত করাতে সক্ষম হন। গ্রামীন ব্যাংক এর সিস্টার কনসার্ন হিসেবে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস গ্রামীন টেলিকম প্রতিষ্ঠা করেন। এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তখন দেখাদেয় কারিগরি সহায়তা। ডক্টর ইউনুস নরওয়ের বৈেদশিক সাহাজ্য সংস্থার সাথে তার পুর্ব সম্পর্কের সুবাদে টেলিনর কে বিনিয়োগ ও কারিগরি সহায়তা দিতে রাজি করাতে সক্ষম হন। জাপানের মারুবেনি কর্পোরেশনও বিনিয়োগে রাজি হয়। টেলিনর প্রথমে বাংলাদেশে বিনিয়োগে তেমন আগ্রহি ছিলনা। তারা তখন প্রাথমিকভাবে পাঁচবছরের জন্য বিনিয়োগে রাজি হয়। কথা ছিল তাদের শেয়ারের বেশিরভাগ অংশ তারা গ্রামীন টেলিকম এবং গনফোনের কাছে বিক্রি করে দিয়ে যাবে এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও তারা হস্তান্তর করবে। এরপর স্থাপিত হয় গ্রামীন ফোন। প্রথম পর্যায়ে গ্রামীন ফোনের শেয়ার হোল্ডিং স্ট্রাকচার ছিল এরকম।
১.টেলিনর,নরওয়ে ৫১%
২.গ্রামীন টেলিকম ৩৫%
৩.মারুবেনি কর্পোরেশন,জাপান ৯.৫%
৪.গনফোন, ৪.৫%
কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত হলে ডক্টর ইউনুসের ব্যাক্তিগত চেষ্টায় মোবাইল টেলিফোন অপারেটরের লাইসেন্স লাভ করে গ্রামীন ফোন। ১৯৯৭ সালের ২৬ শে মার্চ কমার্শিয়াল অপারেশন শূরু করে গ্রামীন ফোন।
বছর দুয়েকএর মধ্যেই এর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারীত হয় ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তি এলাকা,চট্টগ্রাম,সিলেট এবং খুলনায়। গ্রামীন ফোনের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান গ্রামীন টেলিকম এসময় শুরু করে ভিলেজ ফোন এর ব্যবসা। গ্রামীন ফোনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গ্রামীন ব্যংক থেকে ঋন দিয়ে গ্রামের দরিদ্র মহিলাদের মধ্যে বিক্রয় করা হয় মোবাইল ফোন। তখন বাংলাদেশে টিএন্ডটির এনডব্লিউডি কল এর রেট ছিল ২০-৪০ টাকা পর্যন্ত। সুতারং প্রথমে মাত্র ১০-১২ টাকা ও পরে মিনিট মাত্র সাত টাকা রেটে গ্রামীন ফোনের মাধ্যমে এক শহর থেকে অন্য শহরে কল করার সুযোগ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠে। গ্রামীন ফোন আস্তে আস্তে বিস্তৃত হতে থাকে সারা দেশে। এর মধ্যে গ্রামীন ফোন ১৯৯৯ সালে লাভ করে একটি সুবর্ন সুযোগ। বাংলাদেশ রেলওয়ে কতৃক স্থাপিত দেশব্যাপি ফাইবার অপটিক কেবল নেটওয়ার্ক টি মেনটেনন্যান্স এবং ব্যবহারের ঠিকাদারি লাভ করে গ্রামীন ফোন। গ্রামীন ফোন দ্রুত এই সুযোগের সদব্যবহার করে দেশের প্রতন্ত অঞ্চলে তাদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত করে। প্রায় জায়গাতেই তারা রেলওয়ের কক্ষে সল্প ভাড়ায় তাদের বেইস ট্রান্সরিসিভার ষ্টেশন বা বিটিএস স্থাপন করে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মফস্বল শহর এবং ব্যবসা কেন্দ্রই রেল ষ্টেশনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিধায় তারা সহযেই তাদের গ্রাহক বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়। এভাবে গ্রামীন ফোন দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক অর্জনে সক্ষম হয়। ইতঃমধ্যে গ্রামীন ফোনের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান টেলিনর দেখতে পায় বাংলাদেশে বিপুল পরিমান লাভের সম্ভাবনা। বাংলাদেশের একটি বিশাল জনশক্তি দেশের বাইরে কর্মরত বিধায় বিপুল পরিমান আর্ন্তজাতিক কল এদেশ থেকে আসা যাওয়া করে। এই কলগুলি তখন ছিল বিটিটিবি এর পুর্ন নিয়ন্ত্রনে। ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টি ভঙ্গিতে পরিচালিত বিটিটিবি এই খাতে সাধরন গ্রাহকদের কোন রকম সুবিধাই দিতে রাজি ছিলনা। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে দেখেছি বিটিটিবি এর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে তখন বাইরের দেশগুলির আন্তর্জাতিক কলের মুল্য ও আমাদের দেশের আন্তর্জাতিক কলের রেটের বিরাট পার্থক্যের কারন জানতে চাইলে তিনি বলেন যে টেলিফোন শুধূমাত্র বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য সুবিধা হওয়া উচিত। রেট কমালে এটি সাধারন মানুষ বেশি ব্যবহার করবে! সেই জন্য কল রেট বেশি রাখা হেেয়ছে। এই অবস্থায় গ্রামীন ফোন দেশে ভিওআইপি প্রযুক্তি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কল পরিচালনা শুরু করে অতি গোপনে। বিটিটিবির কর্মকর্তা দের এবং সরকারের দুরদর্শিতার অভাব এবং ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা একটি আধুনিক প্রযুক্তির বৈধ ব্যবহার থেকে দেশের মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়। গ্রামীন ফোন এই সুযোগ গ্রহন করে। গ্রামীন ফোন ২০০৩ সাল থেকেই লাভ করতে শুরু করে। ২০০৪ সালে গ্রামীন ফোন ১৫ লক্ষ গ্রাহকের কাছে পেীছাতে সক্ষম হয়। বিপুল পরিমান গ্রাহক ও লাভের অংক টেলিনর কে বাংলাদেশে ব্যবসার ব্যাপারে অতি আগ্রহি করে তোলে। টেলিনর গ্রামীনফোনে তাদের শেয়ার বাড়াতে সচেষ্ট হয়। ততদিনে বাংলা দেশে অন্য দুটি জিএসএম অপারেটর একটেল ও বাংলালিংক তাদের সেবার মান ও পরিধি বৃদ্ধি করেছে এবং সিটিসেলও তার পুরানো মানসিকতা ঝেড়েফেলে ব্যবসায় উদ্যোগি হয়েছে। টেলিনর এই পর্যায়ে গ্রামীরফোনের উপর তাদের নিয়ন্ত্রন বাড়াতে প্রথম থেকে গ্রামীনফোনে কর্মরত উচ্চপদস্থ বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের ছাঁটাই করা শুরু করে। গ্রামীন ফোনের সপ্নদ্রষ্টা ডক্টর ইকবাল কাদির প্রথম থেকে গ্রামীনফোনের ফিনান্স ডিরেক্টর থাকলেও ২০০১ সালে তিনি হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। বাংলাদেশে টেলিকম মার্কেটিংএর অন্যতম সফল ব্যাক্তিত্ব মেহবুব চেীধুরি যিনি মার্কেটিং ডিরেক্টর ছিলেন তাকে অবসর দেয়া হয়। কাস্টমার সার্ভিস ডিরেক্টর নায়লা চেীধুরি পাকিস্তানে টেলিনরের নতুন প্রজেক্ট এ ডিরেক্টর হিসেবে চলে যান । অন্যান্য অনেক পদেও গ্রামীন ফোনের শুরুথেকে কর্মরত দক্ষ ও অভিজ্ঞ বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বদলে নিয়োগ দেয়া হয় অদক্ষ,অনভিজ্ঞ ও জি হুযুর টাইপের বাংলাদেশি কর্মকর্তদের। কয়েকজন বিশেষ করে এক উচ্চ পদস্থ মহিলা কর্মকর্তা তো ছিলেন স্রেফ শো-পিস। এর মধ্যে অনেকেই অতি অল্প সময়ে ডেপুটি ম্যানেজার বা এধরনের পদ থেকে জেনারেল ম্যানেজারের পদে পদোন্নতি পান। এভাবে পদন্নোতি দেয়ার পিছেনে ছিল এরা নিজেদের পদ ও বেতনের লোভে টেলিনর এর কোন রকম বিরোধিতা বা দেশিয় বিনিয়োগকারীদের প্রতি সহানুভুতির কোন সুযোগ পাবেনা। টেলিনর এরপর গ্রামীনফোনে তার শেয়ার বিক্রয় করে দেয়ার জন্য ডক্টর ইকবাল কাদিরের উপর চাপ সৃস্টি করে। হার্ভাড বিজনেস রিভিউতে প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায় ২০০৪ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি টেলিনরের দুজন কর্মকর্তা বস্টনে তার সাথে দেখা করে শেয়ার বিক্রির জন্য চাপ দেয়। তখন রাজি না হলেও নানামুখি চাপের কারনে ২০০৫ সালের শেষের দিকে ডক্টর ইকবাল কাদির তার শেয়ার বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। তথাপি তিনি গনফোনের ৪.৫ শতাংশ শেয়ারের মধ্যে ২.৫ শতাংশ গ্রামীন টেলিকম কে বিক্রি করেন। বাকি ২ শতাংশ টেলিনর অধিগ্রহন করে। মারুবেনি কর্পোরেশনের শেয়ার পুরোটাই টেলিনর কিনে নেয়। ই্তঃমধ্যে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য সরকার গ্রামীন ফোনের উপর চাপ সৃস্টি করে। এ অবস্থায় গ্রামীন টেলিকমের শেয়ার অধিগ্রহনের জন্য টেলিনরের চেষ্টা সাময়িক ভাবে কমে যায়। শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হতেও গ্রামীনফোন (মূলত টেলিনর) গড়িমসি করতে থাকে। তাদের যে সকল খোঁড়া অজুহাত ছিল তালিকাভুক্তনা হওয়ার পিছনে তার মধ্যে একটি ছিল বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের নাকি গ্রামীন ফোনের শেয়ার কেনার মত প্রয়োজনিয় বাজার মূলধন নেই। শেয়ার ছাড়ার সময়ও টেলিনর গ্রামীন টেলিকম ও টেলিনর এর অংশ থেকে সমান পরিমান শেয়ার অফলোড করানর চেষ্টা করে যাতে গ্রামীন টেলিকমের অংশ কমে যায় তবে শেষ পর্যন্ত গ্রামীন টেলিকম তার অংশ থেকে ৩ শতাংশ শেয়ার ছাড়তে রাজি হয়। এর মধ্যে ঘটে যায় ১/১১। এই সময় ভিওআইপিএর অভিযোগে অন্যান্য টেলিকম সংস্থার সুইচে ও অফিসে যেীথবাহিনী অভিযান চালালেও গ্রামীনফোন বেচে যায়। তবে গ্রামীনফোনকে একটি অংক জরিমানা করা হয়। তবে এসময়ই গ্রামীন ফোন শেয়ার বাজারে আসতে বাধ্য হয় পুর্ববর্তি সরকারের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায়। বর্তমানে গ্রামীন ফোনের শেয়ার হোল্ডিং এর অবস্থা নিন্মরুপ।
১.টেলিনর,নরওয়ে ৫৫.৮%
২.গ্রামীন টেলিকম বাংলাদেশ ৩৪.২%
৩.শেয়ার বাজারের বিনিয়োগ কারিরা ১০%
উল্লেখ্য শেয়ার বাজারের ১০% এর মধ্যে অর্ধেক গ্রামীন ফোনের কর্মকর্তা/কর্মচারী ও বিভিন্ন র্পুব নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর প্লেসমেন্ট শেয়ার।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে দেশিয় বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত পিএসটিএন অপারেটরগুলি বন্ধ করে দেয় হয় ভিওআইপি করার অজুহাতে। অন্যদিকে গ্রামীনফোন এখন একই ব্যাবসা করে যাচ্ছে মুক্তভাবে।
সমস্যাথেকে মুক্তি পেয়ে টেলিনর এখন গ্রামীন টেলিকমএর শেয়ার অধিগ্রহনের জন্য তাদের চেষ্টা পুনরায় জোড়েশোরে শুরু করেছে। তারই জন্য প্রচার প্রপাগান্ডার অংশ হিসেবে যে নরওয়ে ডক্টর ইউনুস কে নোবেল পুরুস্কার দিয়ে সন্মানিত করেছে তারাই এখন তার চরিত্র হনন এর চেষ্টা করছে।
গ্রামীন ব্যাংক ও ডক্টর ইউনুস এর কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ অনেক আগের। সেসময় অভিযোগকারীদের মেীলবাদি বলেও অনেকে প্রচার করত। হঠাৎ করে এতদিন গ্রামীন ব্যাংক ও ডক্টর ইউনুসের বন্দনায় লিপ্ত ওয়েব ভিত্তিক সংবাদ সংস্থার হেডলাইনে ডক্টর ইউনুসের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন অবশ্যই অবাক হওয়ার মত। পরদিন হরতালের মত ঘটনা বা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বদলে সারাদিন ধরে এই বিষয়টি হেডলাইনে রাখাও এই প্রচারনার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি করে।

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর প্রতিষ্ঠাতা। মেজর আবদুল গনি।

গতকাল ১১ ই নভেম্বর ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মেজর আবদুল গনির মৃত্যু বার্ষিকি। বাংলাদেশের স্বাধিনতার পিছনে যেই রেজিমেন্ট এর সৈনিক দের অবদান সর্বাধিক। কিন্তু বাংলাদেশের পত্রিকাগুলির মত ব্লগেও তাকে স্মরন করার অভাব দেখে সত্যিই অবাক হয়েছি।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত তার ছোট জীবনিটি অবলম্বনে এই লেখাটি লিখছি।

মেজর আবদুল গনি ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের ১লা ডিসেম্বর কুমিল্লার বুড়িচং এর নাগাইস গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তার পিতা শরাফত আলি ছিলেন একজন মধ্যবিত্ত কৃষক। সে সময়ে তিনি এন্ট্রান্স বর্তমান এস,এস,সি সমমানের শিক্ষা লাভ করেছিলেন যা তখনকার মুসলিমদের মধ্যে দুর্লভ ছিল সেই সঙ্গে এন্ট্রান্স পাস করেও কোন চাকরি গ্রহন না করে স্বাধিন ভাবে নিজের জমিজমার দেখাশোনা করে জীবিকা নির্বাহ করাও ছিল অভিনব। মেজর আবদুল গনি আড়াই বছর বয়সেই মা জোবেদা খাতুনকে হারান। আবদুল গনি প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয় মাদ্রাসায়। প্রাথমিক মাদ্রাসা শিক্ষা শেষে তিনি চট্টগ্রাম হাই মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এ সময় তিনি চট্টগ্রামে কর্মরত মুসলিম ম্যাজিস্ট্রেট হামিদ হাসান নোমানির দৃষ্টি আকর্ষন করেন। নোমানি সাহেব তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন এবং চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুলে ভর্তি করে দেন। স্কুলে নিচের ক্লাশে ভর্তি হতে বাধ্য হওয়ার কারনে কয়েক বছর পিছিয়ে পড়লেও নোমানি সাহেবের সহায়তায় তিনি ১৯৩৬ সালে খুলনা জেলা স্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষায় উত্তির্ন হন। এর পর কলকতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং আই,এ পাস করেন। এরপর একই কলেজে বি,এ তে ভর্তি হন। পরীক্ষার ফলাফল দেয়ার আগেই তিনি কলকাতা ফায়ার ব্রিগেডে অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ছিলেন ফায়ার ব্রিগেডের প্রথম মুসলিম অফিসার। দ্বিতিয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তৎকালিন বৃটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতিয় ও বিশেষ করে বাঙ্গালিদের যোগদান সহজ করা হয়। এই সময় তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদেন এবং কিংস কমিশন অফিসার হিসেবে মনোনিত হন। তিনি প্রথমে ইন্ডিয়ান পাইওনিয়ার কোরে নিযুক্ত হন। পাইওনিয়ার কোর মুলত যুদ্ধের সময় সাময়িকভাবে রিক্রট করা সৈনিকদের নিয়ে গঠিত হয়। এরা সাধারনত সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহন করেনা। কিন্তু তৎকালিন ক্যাপ্টেন আবদুল গনিকে বার্মা ও আরাকানে সম্মুক যুদ্ধের জন্য প্রেরন করা হয় তার কোম্পানি সহ। যুদ্ধ শেষে ক্যাপ্টেন গনি তার মায়ের চাচাত ভাই মাওলানা আবদুল গফুরের কন্যা আসিয়া বেগম কে বিয়ে করেন। যুদ্ধের পর ভারতিয় পাইওনিয়ার কোরের অধিকাংশ ইউনিট ভেঙ্গে দেয়া হলেও বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করায় মেজর আবদুল গনির কোম্পানি সহ বাঙ্গালি মুসলিমদের নিয়ে গঠিত দুটি কোম্পানী (কোম্পানী নং ১২৫৬ ও ১৪০৭) কে নিয়মিত সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মেজর গনি ১৯৪৭ সালে তৎকালিন স্বাধিন রাজ্য হায়দারাবাদের ঝালনায় পাইওনিয়ার কোর সেন্টার এ কর্মরত ছিলেন। উপমহাদেশের বিভক্তি নিশ্চিত হলে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে অপশন দেন এবং ১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসে হায়দারাবাদ থেকে ৭০০ মুসলিম সৈনিক সহ ঢাকায় আগমন করেন। ঢাকায় এসেই ক্যাপ্টেন আবদুল গনি বাঙ্গালি মুসলিমদের নিয়ে একটি সতন্ত্র রেজিমেন্ট গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা শুরু করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি তৎকালিন পাকিস্তান সেনাবাহিনি প্রধান জেনারেল স্যার ফ্রান্ক মেজারভির কাছে পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। তার এই তৎপরতা উচ্চ পদস্থ অনেকেরই পছন্দ হয়নি। তাকে সেনাবাহিনীর বাইরে ন্যাশনাল গার্ডে ডেপুটেশনে পোস্টিং দেয়া হয়। কিন্তু তৎকালিন প্রধানমন্ত্রি খাজা নাজিমুদ্দিনের হস্তক্ষেপে তাকে শেষ পর্যন্ত রিক্রুটিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। এই পদে থেকে তিনি দ্রুততার সাথে একটি ব্যাটালিয়ন তৈরির জন্য প্রয়োজনিয় জনশক্তি রিক্রুট করে ফেলেন। অবশেষে ১৯৪৮ সালের ১৫ ই ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক ভাবে লেঃকর্নেল ভি,জে,ই প্যাটারসন কে কমান্ডিং অফিসার করে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে তৎকালিন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ও অবিসংবাদি নেতা মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ উপস্থিত ছিলেন এবং গার্ড অফ অনারে সালাম গ্রহন করেন। মেজর আবদুল ওয়াহিদ চেীধুরি ট্রেনিং কোম্পনির অধিনায়ক নিযুক্ত হন এবং আরো একটি ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু হয়। ক্যাপ্টেন আবদুল গনি রিক্রুটিং অফিসার হিসেবে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জন্য সৈন্য সংগ্রহ করতে থাকেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর দ্রুত প্রসার অনেকেরই পছন্দ হয়নি। ক্যাপ্টেন গনিকে আবারও পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ডে নিযুক্ত করা হয়। পরে তাকে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এ পোস্টিং দেয়া হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি সময়মত প্রমোশন ও যোগ্যতা অনুযায়ি পোস্টিং না দেওয়ার প্রতিবাদে অবসর গ্রহন করেন। অবসরের পূর্বে তাকে মেজর পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। অবসর গ্রহনের পর মেজর গনি জীবন ধারনের জন্য ব্যবসা শুরু করেন পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডেও জড়িত হয়ে পরেন। ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে যুক্ত ফ্রন্ট ও আওয়ামি লিগ থেকে মনোনয়ন পেলেও তিনি তা প্রত্যাখান করেন। একই সাথে মুসলিম লিগের কাজ দেখে তার প্রতিও বিতঃশ্রদ্ধ হয়ে তিনি সতন্ত্র প্রার্থি হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহন করেন এবং যুক্তফ্রন্ট ও মুসলিম লিগ উভয়ের প্রার্থিকে পরাজিত করে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি মুসলিম লিগের বিকল্প হিসেবে ইসলামি আদর্শ ভিত্তিক একটি দল প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা চালাতে থাকেন। ১৯৫৭ সালে তিনি দ্বিতিয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্তন সৈনিকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদানের জন্য তৎকালিন পশ্চিম জার্মানির রাজধানি বন নগরীতে গমন করেন। সম্মেলন শেষে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তিনি ১৯৫৭ সালের এগারই নভেম্বর ইন্তেকাল করেন। তার মৃতদেহ দেশে ফেরত আনা হয় এবং কুমিল্লা সেনানিবাসে কবর দেয়া হয়। ব্যাক্তিগত জীবনে মেজর গনি ছিলেন একজন অত্যন্ত ধর্মপরায়ন ব্যাক্তি। এমনকি সেনাবাহিনিতে কর্মরত থাকা অবস্থায়ও তিনি ধর্মপরায়ন ছিলেন। সেনাবাহিনির তৎকালিন সংস্কৃতিতে মদ্যপান প্রচলিত থাকলেও তিনি কোনদিন মদ পান করেননি। সেনাবাহিনিতে প্রচলিত পার্টিতে তার স্ত্রীকে কখনই নিয়ে জাননি। তার স্ত্রীও ছিলেন একজন ধার্মিক মহিলা। মেজর গনি খেলাধুলা পছন্দ করতেন এবং একজন দানশীল ব্যাক্তি হিসেবে তার এলাকায় খ্যাত ছিলেন। মেজর গনি তিন কন্যা ও দুই পুত্রের জনক ছিলেন। তার উভয় পুত্রই বাংলাদেশ সেনাবাহিনিতে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর প্রতিষ্ঠায় মেজর আবদুল গনির অবদান সর্বাধিক। এই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টই ১৯৭১ সালের মুক্তযুদ্ধ ও বর্তমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনির নিউক্লিয়াস্। তথাপি মেজর আবদুল গনির মত ব্যাক্তিকে স্মরনকরতে আমাদের অনেক মিডিয়ার দৈন্যতা ব্যথিত করছে আমাকে।

সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১২

র‌্যাগিং ! জীবনের বাস্তবতার শিক্ষা না অপসংস্কৃতি।

র‌্যাগিং নামক অপসংস্কৃতি বর্তমানে আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছে প্লেগের মত। যদিও র‌্যাগিং একেবারে নতুন কিছূ নয় এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে তা অনেকদিন ধরেই প্রচলিত। কিন্তু বর্তমানে র‌্যাগিং যে রুপ ধারন করেছে তা একান্তই অশ্লিল এবং অত্যাচার মাত্র। বুয়েট,জাহাঙ্গিরনগর এই দুটি বিশ্ব বিদ্যালয়ে র‌্যাগিং এর কথা অনেক আগে থেকে শোনা গেলেও ঢাকা বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা কলেজ,জগন্নাথ কলেজ বা চট্টগ্রাম কলেজ এর মত প্রতিষ্ঠানগুলিতে র‌্যাগিং এর উপস্থিতি ছিল খুবই কম ফলে তা কারো দৃষ্টি আকর্ষন করতোনা। কিন্তু বর্তমানে প্রায় সকল সরকারী এবং বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে হাই স্কুলে ও র‌্যাগিং এর নামে যথেচ্ছ আচরনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আগেও অনেকে র‌্যাগিং এর শিকার হলেও তা হতো অনেকটাই দলগত পর্যায়ে এবং তা শারিরিক বা মানসিক বেশি ক্ষতিকর হতোনা বিধায় র‌্যাগিং এর শিকার হলেও তা নিয়ে বেশি আলোচনা কেউ করতোনা। কিন্তু বর্তমানে তা অতিরিক্ত ক্ষতিকর পর্যায়ে চলে গেছে। র‌্যাগিং এর শিকার হয়ে আত্মহত্যা করার এবং স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার ও সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে।

র‌্যাগিং পৃথিবীর সবদেশেই কমবেশি প্রচলিত। উত্তর আমেরিকায় এটি প্রচলিত হেজিং বলে। বৃটিশ পাবলিক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এক সময় এটি প্রায় রিচুয়্যাল বা ধর্মিয় অনুষ্ঠানের মতই ছিল। তবে বর্তমানে উন্নত বিশ্বে র‌্যাগিং কে কঠোর ভােবই নিয়ন্ত্রন করা হচ্ছে। র‌্যাগিং এর শুরুর ইতিহাস পাওয়া যায় খৃষ্টপুর্ব ৮০০ সনের থেকে যখন গ্রীসের অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করতে আসা নতুন প্রতিযোগিদের কে নানা ভাবে উত্তক্ত করা হত যাতে তারা পুরনো প্রতিযোগিদের হারাতে না পারে। এরপর বিভিন্ন দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এর প্রচলন হয়। বিশেষ করে বৃটিশ অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাবলিক কলেজগুলিতে র‌্যাগিং কে অতিপ্রয়োজনিয় বলে মনে করা শুরু হয়। নতুন আসা এক তরুন ছাত্রকে তার কৈশোরের রোমান্টিক সপ্নকে ভুলিয়ে বাস্তব জীবনের সাথে পরিচিত করানর পদ্ধতি হিসেবেই র‌্যাগিং কে গ্রহন করা হয়। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতি ও শৃঙ্খলার সাথে একিভুত করাও ছিল এর উদ্যেশ্য। তখন র‌্যাগিং টি ছিল কেীতুক করা বা শারিরিক পরিশ্রম করানো মাত্র। অত্যাচারের পর্যায়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে। যুদ্ধ ফেরত বয়স্ক ছাত্ররা যুদ্ধের সময় যে ভয়ংকর আচরন দেখেছিল তা অন্যদের উপর প্রয়োগ করা শুরু করে। এভাবে র‌্যাগিং ভয়ংকর একটি বিষয়ে পরিনিত হয়। র‌্যাগিং একটি সাধারন শৃঙ্খলা শেখানোর পদ্ধতি থেকে হয়ে যায় অত্যাচারের সুযোগ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার পদ্ধতি হিসেবে। উপমহাদেশে র‌্যাগিং এর প্রচলন হয় প্রধানত অভিজাত ইংরেজি স্কুলগুলিতে। এসব প্রতিষ্ঠান মুলত বৃটিশ পাবলিক স্কুলের ধারায় এই সংস্কৃতির প্রচলন করে। এক পর্যায়ে এটিও অত্যাচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়। তবে উপমহাদেশে বিশ্ব বিদ্যালয় পর্যায়ে র‌্যাগিং শুরু হয় ষাটের দশকে। এর পর আশির দশকের শেষ দিকে তা ভারত ও শ্রীলংকায় ভয়ংকর রুপ ধারন করে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানেও এর প্রচলন তখনই হয়। এবং এটি বৃদ্ধি পেয়ে এখন একটি ভয়ংকর ব্যাধিতে পরিনিত হয়েছে।
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে র‌্যাগিং এর প্রবনতা বৃদ্ধি পায় নব্বই এর দশকে। যদিও বিভিন্ন সুত্র মতে জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েটে আগে থেকেই বেশ ভয়ংকর র‌্যাগিং ছিল। আমাদের দেশে র‌্যাগিং এর সৃষ্টি প্রধানত ভারতিয় বিশ্ববিদ্যালগুলিকে অনুকরন করতে গিয়ে। ভারতে একসময় র‌্যাগিং এমন ভয়ংকর ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এক বছরে প্রায় ৩০ টি মৃত্য ও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটতে শুরু করেছিল শুধু র‌্যাগিং এর কারনে। যার কারনে ভারতিয় সুপ্রীম কোর্ট র‌্যাগিং সম্পর্কে তদন্তের জন্য গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই এর সাবেক পরিচালকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করার আদেশ দেয়। এছাড়াও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষগুলিকে র‌্যাগিং বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। এতে করে র‌্যাগিং কমে আসলেও সর্বশেষ ভারতের বিভিন্ন যায়গায় র‌্যাগিং এর কারনে ২০০৯ সালে কমপক্ষে সাত জনের মৃত্য ও আত্মহত্যার খবর জানা গেছে। ভারতের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত বন্ধু বান্ধবদের কাছে শুনে এবং স্যাটেলাইট টেলিভিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশে র‌্যাগিং পরিচিত হয়ে উঠে। জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানিক কান্ড এর রিপোর্ট মিডিয়ায় আসার পরই র‌্যাগিং সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য মানুষ জানতে পারে। আগে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলি ছাড়াও বাংলাদেশে মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ি শাহজালাল এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিংএর প্রবনতা ছিল। তবে এখন এটি ঢাকা ,চট্টগ্রাম বা রাজশাহির মত পুরোন বিশ্ববিদ্যালয়েও ছড়িয়ে পড়েছে। র‌্যাগিং এর নামে নতুন ছাত্র-ছাত্রি কে সিগারেট টানতে বাধ্য করা , ছেলে মেয়ে হাত ধরা বা জোড় করে আলিঙ্গন করতে বাধ্য করার মত ঘটনাতো সাধারন হয়ে গেছে। দোতলা থেকে লাফদিতে বাধ্য করার মত নিষ্ঠুরতাও র‌্যাগিং এর নামে করা হয়। আর র‌্যাগিং এর নামে সবচেয়ে বেশি যে অপরাধটি করা হয় তা হচ্ছে যেীন হয়রানি। ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে এই হয়রানির শিকার হয়। বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশে বর্তমানে র‌্যাগিং এর নামে মুলত যেীন হয়রানিই করা হয় এবং নৈতিকতার পতনের কারনে এজন্যই র‌্যাগিং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

র‌্যাগিং এর পক্ষে কয়েকটি মিথ গড়ে উঠেছে এগুলি হচ্ছে।

১.র‌্যাগিং একজন নবিন ছাত্রকে শক্ত ও আত্মবিশ্বাসি করে তোলে।
প্রকৃত সত্য হচ্ছে র‌্যাগিং একজন অনভিজ্ঞ ছাত্রকে ভিতু ও হীনমন্য করে তোলে।

২.র‌্যাগিং নতুন ও পুরাতনের মধ্যে সেতু বন্ধন তৈরি করে।
প্রকৃত সত্য হচ্ছে এখানে নতুন রা পুরাতনদের অত্যাচারি ও অভদ্র হিসেবে দেখে ফলে তাদের মনে ঘৃনা সৃষ্টি হয়।

৩.র‌্যাগিং নতুনদের মধ্যে শৃঙ্খলা এবং একতাবোধ তৈরি করে ও প্রতিষ্ঠানের নিয়মাবলির মেনে চলার মানসিকতা তৈরি করে।
প্রকৃত সত্য এই র‌্যাগিং অন্যদের প্রতি ঘৃনা ও অবজ্ঞার সৃষ্টি করে এবং অমানবিক এই আচরনের শিকারদের মধ্যে সেই প্রতিষ্ঠানের নিয়মাবলির প্রতি অশ্রদ্ধার সৃষ্টি করে যা তাকে যন্ত্রনা দিয়েছে এবং এর ফলে সে অবচেতন ভাবেই প্রতিষ্ঠানের নিয়মাবলির ভাংতে উৎসাহিত হয়। আর একতার নামে সৃষ্টি করে মব মাইন্ড অর্থাত দলবদ্ধ হয়ে ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত হওয়ার প্রবনতা।

৪. র‌্যাগিং এর মাধ্যমে নতুনদের জীবনের বাস্তব অবস্থার সাথে পরিচিত হতে সাহাজ্য করে।
প্রকৃত সত্য এই বৃটিশ পাবরিক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে অভিজাত ঘরের সন্তানেরা পড়তে আসত তারা বাস্তব পৃথিবী সম্পকেৃ খুব কমই ধারনা রাখত তাদের জন্য এটি সঠিক হলেও বর্তমান বাংলাদেশের যেখানে অসংখ্য মেধাবী ছাত্র নিজের পড়ার খরচ যোগায় টিউশনি করে বা কাজ করে তারা জীবন সম্পর্কে যথেষ্টই জানে।

৫. র‌্যাগিং বড়দের সন্মান ও শ্রদ্ধা করতে শেখায়।
এটি সম্পুর্ন মিথ্যা। সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও পারিবারিক শিক্ষার ফলে আমাদের দেশে এমনিই একজন বড়ভাই এর প্রতি শ্রদ্ধার আভাব থাকেনা। র‌্যাগিং বরঞ্চ সিনিয়রদের প্রতি ঘৃনার সৃষ্টি করে। জুনিয়ররা যেখানে এমনিতেই সিনিয়রদেরকে সন্ম,ান করে তাদের নির্দেশ পালন করে সেখানে তাদের এই শ্রদ্ধার সুযোগ নিয়ে তাদেও উপর অত্যাচার চালানো হয়। এই অত্যাচার তাদের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এক সময় তারাও তাদের জুনিয়র দের উপর অত্যাচার চালানোকে স্বাভাবিক বলে মনে করে। এই প্রবনতা অনেকের পেশাগত জীবনেও চলে আসে যার ফলে উর্ধতনদের কাছে কেঁচো হয়ে থাকলেও তারা অধঃস্থনদের জন্য অত্যাচারি বাঘের রুপ ধারন করে।

র‌্যাগিং বৃদ্ধি পাওয়ার প্রধান কারনগুরি হচ্ছে
১.অপসংস্কৃতির প্রাদুর্ভাব।
২.জোড় করে কতৃত্ব নেওয়ার মানসিকতার বৃদ্ধি।
৩.দুর্বলের প্রতি অত্যাচার করার সহজ সুযোগ।
৪.নিজে র‌্যাগিং এর শিকার হওয়ার কারনে র‌্যাগিং কে অধিকার বলে মনে করা।
৫.বড়দের প্রতি স্বাভাবিক শ্রদ্ধার কারনে এবং ভয়ে র‌্যাগিং এর প্রতিবাদ না করা।
৬.র‌্যাগিং কারি রা পরবর্তিতে সাহাজ্য করবে এই ধারনা রাখা। আমাদের মুখস্ত করা ও নোট নির্ভর পড়াশুনার সংস্কৃতিতে সিনিয়রদের থেকে নোট পাওয়া অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করা হয়। ফলে র‌্যাগিং এর শিকার হলেও এর প্রতিবাদ না করা।

র‌্যাগিং এর শুরুর পিছনে যে উদ্দ্যেশ্যই থাকুকনা কেন বর্তমানে র‌্যাগিং শুধু প্রধানত যেীন হয়রানির সুযোগ এ পরিনত হয়েছে। অন্যদিকে নতুন ছাত্র-ছাত্রি যারা নতুন পরিবেশে একটু সহানুভুতি ও সহায়তার প্রত্যাশা করে তাদেরকে ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে করে তোলে মানসিক ভাবে অসুস্থ। তার মধ্যে তৈরি করছে ঘৃনার অনুভুতি এবং জ্বালিয়ে তুলছে প্রতিশোধের আগুন। এই আগুন নিভাতে অক্ষম হয়ে সে আবার তার জুনিয়রদের উপর অত্যাচার চালিয়ে তৃ্িপ্ত লাভ করার চেষ্টা করছে। র‌্যাগিং অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রির মেধাবিকাশের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে । একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এখানে বলা যায়। আমার একজন আত্মিয়া চট্টগ্রাম বোর্ড থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি ও এইচএসসি জিপিএ ৫ সহকারে উর্ত্তিন হয়ে একটি বিভাগিয় শহরে এক মহান বীর ও মানবপ্রেমির সাধকের নামাংকিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল নিজের সবচেয়ে পছন্দনিয় বিষয়ে। আমি নিজেও তখন কর্মসুত্রে সেই শহরে ছিলাম। মাস ছয়েক পর একদিন সে আমাকে টেলিফোনে জানায় যে সে বাড়িতে চলে যাচ্ছে এবং সে আর লেখাপড়াই করবেনা। আমি তখন তার কাছ থেকে কিছু জানতে না পারলেও পরে জানতে পাড়ি ক্লাসে ও হোষ্টেলে র‌্যাগিং এর শিকার হয়ে সে ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়। প্রায় এক বছর সে লেখা পড়া করেনি। পরে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ উত্তির্ন হয়ে বর্তমানে একটি গ্রুপ অফ কোম্পানি তে কর্মরত আছে। র‌্যাগিং এভাবে কত মেধাবী শিক্ষার্থির জীবন চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছে তার হিসাব নেই। এই ভয়ংকর ও সমাজ বিরোধি অপস্স্কংৃতির আশু সমাপ্তি হওয়া প্রয়োজন।

র‌্যাগিং প্রতিরোধে করনিয়
১.নিজে র‌্যাগিং এর শিকার হয়ে থাকলেও জুনিয়রদের প্রতি প্রতিশোধ নেয়া থেকে বিরত থাকুন এবং বন্ধুবান্ধবদের বিরত রাখুন।
২. নিজের ছোট ভাই বোন দের প্রতি লক্ষ রাখুন তারা যেন র‌্যাগিং না করে এবং র‌্যাগিং এর শিকার না হয়।
৩. র‌্যাগিং এর শিকারদের ”ইউনিভার্সিটিতে এরকম হয়, ওটা কিছুনা”। ”বড় ভাইবোনরা এরকম করেই” । ”যাই করুক বড়দের তো সন্মান করতে হবে” এই জাতিয় কথায় না ভুলিয়ে প্রতিবাদ করার সাহস দিন। অন্তত পক্ষে তার প্রতি সহানুভুতি প্রকাশ করুন এবং অত্যাচারিকে অত্যাচারি বলে রায়দিন।

সকলের যেীথ উদ্যোগ র‌্যগিংকে প্রতিরোধ করবে ইনশাআল্লাহ।

বাংলা চলচ্চিত্রের অর্ধ শতাব্দীর অবসান

বিশিষ্ট অভিনেতা সাইফুদ্দিন আহমদ সোমবার বেলা তিনটায় সিএমএইচ এ ইন্তেকাল করেছেন(ইন্নাইলাইহে ওইন্নাইলাইহে রাজেউন)। তার ইন্তেকালের সাথে সাথে সমািপ্ত হলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের একটি যুগ নয় বরং অর্ধ শতাব্দির। ১৯৫৬ সালে বাংলাদেশে নির্মিত প্রথম ছায়াছবি মুখ ও মুখোশ এ অভিনয়ের মাধ্যমে কেীতুক অভিনেতা হিসেবে তার যাত্রা শুরু। ছবিটিতে তিনি কমেডিয়ান বা কেীতুক অভিনেতা হিসেবে চাকরের ভুমিকায় অভিনয় করেন। তার বিপরিতে অভিনেত্রি ছিলেন বিলকিস বারি। সেই থেকে শুরু করে প্রায় অর্ধ শতাব্দি সময় সিনেমা,টেলিভিশন,মঞ্চ এবং রেডিওতে দাপটের সাথে অভিনয় করে কাটিয়েছেন। বয়স এবং বর্তমান সিনেমার পরিবেশের কারনে সিনেমায় অভিনয় ছেড়ে দিলেও শেষ দিকে টেলিভিশন নাটকে এবং ইত্যাদি অনুষ্ঠানের বিভিন্ন কেীতুক স্কিটএ অভিনয় করতেন। ইত্যাদির প্রথম দিকের মিঠু ও তার করা দাদা নাতির আইটেম টি ছিল নিয়মিত। টেলিভিশন বা সিনেমায় সকল প্রজন্মের দর্শকের কাছে প্রিয় ও পরিচিত মুখ ছিলেন সাইফুদ্দিন।

আসাম প্রদেশের ধুবড়িতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম সাইফুদ্দিন আহমদের। পিতা মুহাম্মদ দীন আহমদ ছিলেন সরকারী কর্মচারি। সেই সঙ্গে একজন উর্দু ও ফারসী ভাষার কবি এবং শেীখিন অভিনেতা। যা তৎকালিন মুসলিম শিক্ষিত সমাজে দুর্লভ ছিল্।স্কুল জীবনেই কিছু অভিনয় করেছিলেন। এবং ভালো গান গাইতেন। দেশ ভাগের পর ঢাকায় আসেন ১৯৫১ সালে চাকরি করেন একটি বেসরকারী প্রতিষ্টানে সেই সঙ্গে মঞ্চ নাটকে অভিনয় করা শুরু করেন। প্রথম বাংলাদেশে নির্মিত বানিজ্যিক ছবি "মুখ ও মুখোশ" এর পরিচালক মরহুম আবদুল জব্বার খান ছিলেন তার আপন দুলাভাই। "মুখ ও মুখোশ"এর পর থেকে তিনি অব্যহত গতিতে এগিয়ে ঘগছেন তার পেশায়। সেই সঙ্গে এদেশের কোটি মানুষের মুখে অন্তত কিছু সময়ের জন্য হাসি ফুটিয়ে তাদের হৃদয়ে স্থান দখল করে নিয়েেছন। সাইফুদ্দিন আহমদ বাংলা ছাড়াও উর্দু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। প্রধানত কেীতুক অভিনেতা হলেও কিছু চলচ্চিত্র ও নাটকে ভিলেন এর অভিনয় ও করেছেন।গান জানলেও মাত্র একটি ছবিতে কন্ঠ দিয়েছেন তিনি।"সুন্দরী" ছবিটিতে ডুয়েট গান গেয়েছেন রুনা লায়লার সাথে। চারশ এর ও অধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। "মুখ ও মুখোশ" ছাড়া তার অভিনিত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে আছে নাচঘর(উর্দু),জোয়ার এলো,নয়নতারা,নীল আকাশের নিচে,আঁকাবাঁকা,বড় ভালো লোক ছিল,চন্দ্রনাথ, রামের সুমতি সহ আরো অনেক। সিনেমার পাশাপাশি রেডিও ও মঞ্চেও দাপটের সাথে অভিনয় করে গেছেন তিনি। কিছুদিন ঠিকাদার হিসেবে ব্যবসাও করেছিলেন তিনি। আবাে চিত্রালীতে কলকাতার বিশিষ্ট কেীতুক অভিনেতা ভানু বন্দোপাধ্যায় এর সাক্ষাতকার গ্রহন করেছিরেন তিনি। দুই শ্রেষ্ঠ কেীতুক অভিনেতার সেই সাক্ষাতকারও হয়েছিল কৈাতুকে ভরপুর।

১৯৬০ সালে সুফিয়া অাহমদ এর সাথে বিয়ে হয় তার। ছেলে সাইদ আহমদ সেনাবাহিনীতে। ২০০৪ সালে তিনি লেঃ কর্নেল ছিলেন। তিন মেয়ে শিখা,সিমি, সাজি সকলেই মাস্টার্স ডিগ্রিধারি ও বিবাহিতা। প্রায় পরিনিত বয়সেই তার মৃত্যু হলেও তার অভাবটি পুর্ন হবার নয়। কারন তার মাপের কোন কেীতুক অভিনেতা কেন অভিনেতাই বাংলাদেশে এখন নেই।
আল্লাহ তাকে জান্নাত নসীব করুন।

দ্রস্টব্য: প্রবন্ধের তথ্যগুলি বিভিন্ন পত্রিকা এবং খন্দকার মাহমুদুল হাসান রচিত ও ঐতিহ্য প্রকাশনি থেকে প্রকাশিত বই "চলচ্চিত্র" থেকে নেয়া।

Palabodol

"পালাবদল" ম্যাগজিনটির মূল উদ্যোক্তা সম্ববত বিশিষ্ট সাংবাদিক জনাব মাসুমুর রহমান খলিলি। ১৯৯০ বা ৯১ সনেই এর প্রথম প্রকাশ। তখন সম্পাদক হিসেবে তার নামই বোধ হয় ছাপা হতো। আমি নিষ্চিত নই। এই ম্যাগাজিনটির সাথে প্রথম থেকেই যারা জড়িত ছিলেন লেখক হিসেবে তাদের মধ্যে বোধহয় মরহুম সৈয়দ আলি আহসান এবং আল মাহমুদের নাম নিলেই এই ম্যাগাজিনটির মান সম্পর্কে ধারনা পওয়া যাবে। আমি পালাবদল প্রথম পড়ি ১৯৯৩ সনের দিকে। তখন পালাবদলের উপদেষ্টা তালিকাতে ছিল সৈয়দ আলি আহসান,আল মাহমুদ,কমোডর(অবঃ)আতাউর রহমান সহ আরো দুয়েক জনের নাম। একটি সুস্থ,মান সম্পন্ন মননশিল ম্যাগাজিনের অভাব বাংলাদেশে সবসময় ছিল এবং এখনও আছে। কিনতু এর মধ্যে পালাবদল এক বিশেষ যুগ এর সৃিষ্ট করেছিল। বিচিত্রা তখনও প্রকাশিত হচ্ছে এবং যায়যায়দিন সম্ভবত পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এই ম্যাগাজিন গুলি ছিল মুলত নিউজ ভিিত্তক। প্রবন্ধ ও সাহিত্যভিত্তিক ম্যাগাজিন হিসেবে পালাবদল খুব দ্রুতই জনপ্রিয়তা অর্জন করে।পালাবদলের প্রতি সংখ্যাতেই প্রায় অনিবার্য উপষ্থিতি ছিল সৈয়দ আলি আহসানের। আর সেই লেখার বিষয়বস্তু ছিল নোবেল বিজয়িদের সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা খেকে শুরু করে বেগুন রান্নার বিভিন্ন পদ্ধতি পর্যন্ত। পালাবদলেই প্রকাশিত হয়েছে সৈয়দ আলি আহসানের আত্মজীবনির বিশেষ বিশেষ অংশ নিয়ে লেখা। যার মধ্যে অতি গুরুত্ব পুর্ন তার বাংলা একাডেমির পরিচালক থাকাকালিন কর্মজীবন এবং বঙ্গবন্ধু যেরকম দেখেছি প্রবন্ধটি। আল মাহমুদ পালাবদলের প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত ছিলেন বলে তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ "বিচুর্ন আয়নায় কবির মুখ" এ উল্লেখ করেছেনে। আমি যখন পালাবদল পড়া শুরু করি তখন পালাবদলে ধারাবহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে আল মাহমুদের অন্যতম শ্রেষ্ট সাহিত্যকির্তি উপন্যাস "কাবিলের বোন"। এমনকি েস সময় আমার পরিচিত কয়েকজন পালাবদল কিনতেন শুধু ওই উপন্যাসটির জন্য। আর আল মাহমুদের কবিতা তো ছিলই। এরা দুজন ছাড়াও নিয়মিত লেখকদের মধ্যে ছিলেন এবনে গোলাম সামাদ যার বিচিত্র বিষয়ের পান্ডিত্যপুর্ন অথচ সহজবোধ্য লেখা সকলকে আকর্ষন করত এবং কখনও বিতর্কের জন্ম দিত। আমার মনে আছে হোমিও চিকিৎসা বিষয়ে তার একটি লেখা নিয়ে বেশ কিছূদিন ধরেই বিতর্ক চলেছিল। আবুল খােয়র মুসলেহ উদ্দিন ও লিখতেন। তার উপন্যাস "কালো কফিন" যা বৃটিশ আমলের সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের নেয়ে লেখা সেটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল পালাবদলে। তার রসালো ভাষায় লেখা গল্প ও প্রবন্দ্ধও নিয়মিতই প্রকাশিত হতো পালাবদলে। সম্ভবত তার শেষ উপন্যাস "মেধাবী মেয়ে" পালাবদলেই প্রকাশিত হয়েছিল এবং বিষয়বস্ত ও ভাষার কারনে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। আবদুল মান্নন সৈয়দ ও পরের দিকে নিয়মিত লিখতেন এবং তার আত্মজৈবনিক কলাম ষাটের দশক জনপ্রিয় হয়েছিল। দার্শনিক মরহূম অধ্যক্ষ দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফ এর কয়েকটি গুরুক্বপুর্ন রচনাও পালাবদলে প্রকাশিত হয়েছে। নিয়মিত না হলেও মাঝেমাঝেই তার লেখা প্রকাশিত হতো। সাহিত্য বিষয়ে নিয়মিত লিখতেন মোশাররফ হোসেন খান ও সায়িদ আবুবকর। সায়িদ আবুবকর পালাবদলের মাধ্যমেই কবি হিেসেবে অনেকর কাছে পরিচিত হয়ে উঠেন। পরের দিকে নিয়মিত আরেকজন লেখক ছিলেন সাহিত্যিক এবং এক সময়ের গীতিকার আবু জাফর। তার "তুমিই পথ প্রিয়তম নবী তুমিই পথেয়" এবং ইকবাল সংক্রান্ত প্রবন্ধগুলি থবই জনপ্রিয় হয়েছিল্। বুলবুল সারওয়ার, হাসান আলিম তমিজউদ্দিন লোদি রা মাঝে মধে্যই লেখতেন। গল্প বা কলাম লিখতেন আফরোজা পারভিন পপি সহ কয়েকজন মহিলা সাহিত্যিক।
পালাবদলে সাময়িক প্রসঙ্গে নিয়মিত প্রবন্দ্ধ লিখতেন সালাউিদ্দন বাবর,মীযানুল করিম, মুহাম্মদ সিদ্দিক,আজিজুল হক বান্না,খায়রুর বাশার,হারুন জামিল,আহমদ জামিল সহ অনেকেই। তবে প্রথমদিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রসং্গে অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ লিখতেন গুরুত্বপুর্ন ও শিক্ষনিয় কলাম। পালাবদলের আরেকজন নিয়মিত লেখক ছিলেন লেঃ আবু রুশদ(অবঃ) বর্তমানে ডিফেন্স জার্নাল এর সম্পাদক। তিনিই প্রথম সম্ভবত সামরিক বাহিনি ও প্রতিরক্ষা সম্পের্ক অনেক কিছুকেই সাধারন পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করেন। তার বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির দিনগুলো ধারাবািহক আত্মজৈবনিক রচনা। সম্ভবত বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির বিষয়ে প্রথম কোন রচনা। সেই সঙ্গে তার থ্রিলার কারাকোরাম উপত্যকায় ও পালাবদলে প্রকাশিত হয়েছিল যা বেশ আলোড়নের সৃস্টি করে। বিজ্ঞান প্রসঙ্গে মরুহম ডঃ শহিদুল্লাহ মৃধার প্রবন্ধগুলি ছির তথ্যপুর্ন ও সুখপাঠ্য্। বিশেষত কয়েকটি বিষয়ে যেমন কাকড়া চাষ,দই উৎপাদন এবং নভোথিয়েটার প্রসঙ্গে তার লেখাগুলি ছিল গুরুত্বপুর্ন। পালাবদলের একটি ঈদ সংখ্যায় তিনি আইজাক আসিমভের সাইন্স ফিকশন গল্পও তিনি ানুবাদ করেছিলেন। তার স্ত্রী চেচনিয়ার অধিবাসি গাগায়েভা কিজিলগুল রোজা ও মাঝে মধ্যে পালাবদলে লিখতেন। পালাবদলের উপদেষ্টা কমোডর(অবঃ) আতাউর রহমানের ভ্রমন কাহিনিগুলি ছিল অত্যন্ত আকর্ষনিয়। বিচিত্র সব স্থানে তার ভ্রমনের অভিজ্ঞতা তিনি লিখেতেন যেসব স্থানের মধ্যে ছিল টিমবাকটু এবং হাওয়াই দ্বিপ।
পালাবদল নিয়মতিই প্রকাশিত হচ্ছিল প্রায় এক যুগের ও বেশি সময় ধরে। মাঝে মাঝে দুয়েকটি সংখ্যা মিস করলেও মোটামুটি ২০০৪ পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশিত হতো পালাবদল। মরহুম আবদুস সালাম সাহেবের সুপরিচালনা ও সম্পাদনায় এর শ্রিবৃদ্ধিও হচ্ছিল ধিরেধিরে। কলকাতার পাক্ষিক "দেশ" এর সাথে অন্তত লেখার মানের দিক দিয়ে তুলনা করার মত ম্যাগাজিন হয়ে উঠেছিল পালাবাদল। যদিও প্রিন্টিং এর ক্ষেত্রে খুব বেশি উন্নতি রাব করতে পারেনি। এর কারন সম্ভবত আর্থিক। পালাবদলে বিজ্ঞাপন ছিল খুবই কম।তার মধ্যে াাবার শেষের ৪-৫ বছর শেষ প্রচ্ছদের বিজ্ঞাপন যা ম্যাগাজিনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দামি হয় তা থাকতো মরুহম সালাম সাহেবের নিজ প্রতিষ্ঠান সালেহীন ইনক এন্ড কেমিক্যালস এর বিজ্ঞাপন। তিনি এভাবে নিজের টাকা দিয়েই প্রত্রিকাটি চালাতেন। ভিতরে ইসলামি ব্যাংক এর একটি বিজ্ঞপন প্রায় থাকতো। এছাড়া কদাচিৎ অন্য কোন বিজ্ঞাপন দেখা যেত। ২০০২ সালের শেষ দিকে হুমায়ুন সাদেক চেীধুরি পালা বদলের নির্বাহী সম্পাদক হন। ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্রায় নিয়মিতই প্রতাশিত হয়েছিল পালাবদল। কিন্তু এরপর বন্ধ হয়ে যায় । বর্তমান সময়ে এই পত্রিকাটির প্রয়োজন আবার অনুভব করছি অনেকেই। পালাবদলের সাথ যারা জড়িত ছিলেন তাদের কে অনুরোধ জানাচ্ছি পালাবদল আবার প্রকাশের ব্যাপরে উদ্যোগ নিতে।